দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ভারতে বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। মঙ্গলবার দিল্লিতে সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিল করার সময় কয়েকজন বিরোধী এমপিকে আটক করে পুলিশ।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন এমপিকে পুলিশ একটি বাসে তুলে নেয়। কিছুক্ষণ পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হলে তারা আবার মিছিল শুরু করেন এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের কাছে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকজন এমপি নির্বাচন কমিশনের ভবনের দিকে যাওয়ার জন্য বিকল্প সড়ক ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। তাদের আটক করে বিভিন্ন থানায় নেওয়া হয়। তবে কতজন আইনপ্রণেতাকে আটক করা হয়েছে, তা জানায়নি পুলিশ। বিরোধীদের দাবি, বিভিন্ন দলের ২৩৭ জন এমপি এ মিছিলে অংশ নেন।
দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পেতে পারে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের Special Intensive Revision (SIR) নামের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম। ২০২৫ সালের জুনে পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যে এ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে তা দেশের অন্যান্য অংশেও সম্প্রসারিত করা হয়। নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে একই ব্যক্তির একাধিক নাম এবং অযোগ্য ভোটারদের বাদ দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিরোধী দল ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় অনেক বৈধ ভোটারের নামও ভুলভাবে বাদ পড়েছে। তারা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কার্যক্রমটি যথাযথভাবে পরিচালনা না করার অভিযোগ তুলেছেন।
সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এমন কিছু সিদ্ধান্ত ও আদেশ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন, যেগুলো তাদের অজ্ঞাতসারে নির্বাচন কমিশনের নামে জারি করা হয়েছিল বলে তারা দাবি করেন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এসব আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন ও বাদ দেওয়া, ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার এবং নির্বাচনী তথ্যের নিরাপত্তার মতো বিষয় ছিল। কিছু আপত্তি সরাসরি ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তবে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কমিশনের দাবি, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন আরও জোরালো হয়। মঙ্গলবার বিক্ষোভ ঘিরে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সংসদ ভবন থেকে কমিশনের কার্যালয় পর্যন্ত সড়কে ব্যারিকেড দেয় পুলিশ।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, তাদের তিনটি দাবি কোনোভাবেই আপসযোগ্য নয়। দাবিগুলো হলো—জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, SIR কার্যক্রম বাতিল এবং কাগজের ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা।
রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারকে উদ্দেশ করে তার পদত্যাগের দাবি জানান।
বিক্ষোভের সমালোচনা করেছে বিজেপি। দলটির এমপি সম্বিত পাত্রা আন্দোলনকে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য পরিকল্পিত একটি প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন।
এদিকে এ বিতর্ক ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও গড়িয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এমন অভিযোগে করা একটি আবেদনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছেন আদালত।
আবেদনে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার এমন কিছু ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন, যা নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিতভাবে প্রয়োগ করার কথা। এসব সিদ্ধান্ত অনুমোদনহীন ছিল কি না, সে বিষয়ে আদালতের রায় চাওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নেওয়ার কথা। এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিল হতে পারে বলেও আদালত ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এ পর্যায়ে জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর নির্দেশ দেননি আদালত। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে মঙ্গলবার ভারতের মুম্বাই ও দিল্লিতে Cockroach Janta Party (CJP) নামে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের উদ্যোগেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। সংগঠনটি এসব কর্মসূচিকে দেশব্যাপী আন্দোলনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং আগামী ১০ অক্টোবর আরও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
এমএস/